বেল্লালের পিঠে ৭১



                   " বেল্লালের পিঠে ৭১"


১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। তখন আমরা ক্লাস ফোরে পড়ি। বাংলাদেশের অভ্যূদ্বয়ের বছরে দেশ জুড়ে চলছে এক অজানা আতঙ্ক; না জানি কখন খান সেনারা হানা দেয়। অন্য অনেক স্থানের ন্যায় রাজশাহী জেলা সদর তখন পাক হায়েনার দখলে। সর্বত্রই অজানা ভয়। জেলার চারঘাট থানার সরদহ ইউনিয়নের থানাপাড়া গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মনে আরো বেশি আতঙ্ক; কারণ এই গ্রামের পশ্চিম পাশে ১৯১২ সালে নির্মিত হয়েছে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার। গ্রামের দক্ষিণ-পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে গেছে দেশের প্রধানতম নদী পদ্মা, আর গ্রামের শেষ মাথায় দক্ষিণ বরাবর বয়ে গেছে পদ্মা বৃহৎ একটি শাখা নদী বড়াল। গ্রামের শিক্ষার হার অনেক বেশি। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েরাও পড়াশুনা করে। এই গ্রামের মানুষ শান্তি প্রিয় বলে অন্য গ্রামের সাথে ঝগড়া-ফ্যাসাদ হয়না। পুরো চারঘাট থানার মধ্য তাই থানাপাড়া গ্রামটি "আদর্শ গ্রাম'" হিসেবে মর্যাদা পেয়েছে। এই গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থাও অন্য গ্রামের চাইতে ভাল। আর এই সব কিছুর জন্য প্রচ্ছন্নভাবে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অবদানের কথা উল্লেখ করা যায়। কিন্তু আজ সেই পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার (পিটিসি) গ্রামবাসীর চিন্তার কারণ! ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর 'সারদা পুলিশ একাডেমি'র বাঙ্গালি পুলিশরা বিদ্রোহ ঘোষণা করে। তারা পুলিশ একাডেমির নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২৩ মার্চ সারদা পুলিশ একাডেমি আর রাজশাহী ক্যাডেট কলেজে (তৎকালীন আইয়ুব ক্যাডেট কলেজ) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। ফলে পাক সেনার দল এই এলাকায় আসলে আগে সারদা পুলিশ একাডেমির দখল নিতে চাইবে, সেটা ছোট-বড় সবারই জানা। আর পুলিশ একাডেমি দখলে নিলে থানাপাড়াতেই সব থেকে বেশি নির্যাতন চালানো হতে পারে এটা তখনকার দিনে অনুমিত ছিল। অনেকে গ্রাম ছেড়ে প্রত্যন্ত কোন অঞ্চলে চলে গেছে। আবার অনেকে পদ্মা পাড় হয়ে ভারতে, কিংবা চারঘাট থানার অধীনে চর খিদিরপুর, চর খানপুরে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। সবাই খুব চিন্তিত। এরই মধ্যে আমাদের গৃহ রাখালটা শান্তি কমিটিতে নাম লিখিয়েছে। একেবারে নিরিহ এক কৃষি শ্রমিক হটাৎ গ্রামের সবথেকে প্রভাবশালী ব্যক্তি হয়ে গেল! গ্রামে তখন হাতে গোনা দুই কি তিনটা রেডিও। আমাদের রেডিওতে খবর শোনার জন্য গ্রামের মানুষ জড়ো হত। রেডিওতে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। গ্রামবাসীর মনে তখন উৎকণ্ঠা। গ্রামের কিছু সাহসী যুবক রেডিওতে স্বাধীনতার ঘোষণা শুনে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।  এমন সময় ১৩ই এপ্রিল খবর এলো যে পাক সেনারা বানেশ্বর আর আড়ানী হয়ে সরদহের নিকট আগাচ্ছে। বানেশ্বরে তাদের প্রতিরোধের মুখে পরতে হয়, তবে তাদের আধুনিক অস্ত্রের কাছে প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়নি। পরে তারা রাজশাহী ক্যাডেট কলেজ ও সারদা পুলিশ একাডেমি দখলে নেয়। সেখানে প্রথমে তাদের কঠোর প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়। তবে বাঙালির সেই প্রতিরোধ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। সেখানে অনেক মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পাক সেনাদের পুলিশ একাডেমি দখলের খবর তখন গ্রামের সবাই জেনে গেছে। যেকোন সময় গ্রামের ভেতরে হায়েনার দল আক্রমণ করবে; বাড়ি-ঘরে আগুন দিবে, গুলি চালাবে, মা-বোনদের উপর নির্যাচন হবে। বেলা ১১ টার দিকে সবাই ছোটাছুটি করতে শুরু করে। তারা সবাই পদ্মা নদীর চরে জড়ো হতে থাকে; উদ্দেশ্য নদী পাড় হয়ে ভারত গমণ। গ্রামের পশ্চিম দিকে পদ্মার চর। চর সংলগ্ন পাড়াটা 'মাছুয়া পাড়া' হিসেবে পরিচিত। এখানে 'মাহে ফরাশ' সম্প্রদায়ের বসবাস। তারা ভারতের বিহার রাজ্য থেকে এসেছে বলে অনুমান করা হয়। তাদের নিজস্ব ভাষা আছে। তারা নিজেরা কথা বলার সময় এই ভাষা ব্যবহার করে। এটা হিন্দি-ভোজপুরির কোন অপভ্রংশ ভাষা বলে অনুমান করা হয়। এই সম্প্রদায়ে প্রধান পেশা নদীতে মাছ ধরা। তাই গ্রামের এই দিকটা 'মাছুয়া পাড়া' বলা হয়। এই গ্রামের এক হতভাগ্য যুবকের নাম 'বেল্লাল হোসেন'। কেউ কেউ ডাকে বেলাল নামে। হালকা গড়ন, ছিপছিপে দেহ। কয়েক মাস আগে তার বিয়ে হয়েছে। গ্রামের সবার সাথে সেও পদ্মার চরে পালিয়ে যায়। পদ্মার চরে তখন কয়েক হাজার দু'য়েক মানুষ। থানাপাড়া বাদে নতুন পাড়া, কুটিপাড়া, গৌশহরপুর থেকে অনেকে লোক জড়ো হয়েছে। অনেকে নৌকা করে পার হচ্ছে কিন্তু বেশির ভাগই দাড়িয়ে আছে। প্রয়োজনের তুলনায় নৌকার সংখ্যা অনেক কম। পদ্মার চরটা পুলিশ একাডেমির ঠিক পেছন বরাবর। পুলিশ একাডেমি থেকে সব দেখা যায়। এদিকে পদ্মা নদী গত কয়েক বছর ধরে পাড়ি ভেঙ্গে ক্রমেই গ্রামের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ফলে নদীর খাঁড়া পাড়ি সৃষ্টি হয়। এই খাঁড়া পাড়ির নিচে আশ্রয় নেয় সব মানুষ। তাদের ধারণা ছিল যে খাঁড়া পাড়ির নিচে থাকলে পুলিশ একাডেমি থেকে পাক সেনারা কাউকে দেখতে পাবে না। তবে বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা। বিপুল সংখ্যক লোকের মাঝে কারো কারো গতিবিধি পাক সেনাদের নজরে আসে। তারা অস্ত্র হাতে চরে অগ্রসর হয়। গ্রামের নিরিহ মানুষ তাদের আগমনের ব্যাপারে কিছুই বুঝতে পারেনি। এমন সময় অনেকটা আকস্মিকভাবে তারা নদীর তীরে এসে হাজির হয়। কিছু যুবক বিপদ বুঝতে পেরে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। পাক সেনাদের পানি ভীতির কথা অনেকেই জানত। যারা নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল, তারা সেদিন বেঁচে গেছিল। কিন্তু সেই সংখ্যা খুবই কম; তার আগেই হায়েনার দল বন্দুক তাক করে। তারা সবাইকে পাড়ি থেকে ওপরে আসতে বলে। একে একে সবাই পাড়ির ওপরে, চরে এসে হাজির হয়। এরপর হায়েনার দল বাচ্চা, বুড়া আর মহিলাদের আলাদা করে তাদের চলে যেতে বলে। বাকি যুবকদের লাইনে দাড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "তোমাদের মধ্যে  সরকারী চাকরি কর কারা কারা?" একজন ভেবেছিলেন যে সরকারি চাকুরেদের ছেড়ে দেওয়া হবে। 'আব্দুল ওয়াহাব' নামের পুলিশ একাডেমির একজন মালী নিজের পরিচয় দিলেন। তাঁকে সাথে সাথে হত্যা করা হয়। তিনিই ১৩ই এপ্রিল ট্র্যজেডির প্রথম শহীদ। এরপর একে একে গুলি ছোড়া শুরু হয়।  মুহূর্তে লুটিয়ে পড়ে শত শত তাজা প্রাণ। অনেকেই আবার কৌশলে গুলি ছোড়ার আগে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। এভাবে অনেকেই প্রাণে বেঁচে যান। বেল্লাল ছিল তাদের মধ্যে একজন। বেল্লাল মাটিতে লুটিয়ে মৃত ব্যক্তির ন্যায় অভিনয় করতে থাকে। মৃত ব্যক্তির রক্ত সে তাঁর শরীরে মেখে নেয়। পাক বাহিনী যখন চলে যাচ্ছিল, তখন বেঁচে যাওয়া কয়েকজন আস্তে আস্তে কথা বলতে শুরু করে। আরো কিছু পরে কয়েকজন উঠে পালানোর চেষ্টা করে। ঠিক তখনই কয়েকজন সেনা পেছনে ঘুরে তাদের দেখতে পেয়ে আবার গুলি বর্ষণ করে। এতে আরো কিছু তাজা প্রাণ ঝড়ে যায়। তখন পাক বাহিনী সব লাশ পেট্রোল দিয়ে পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়, যাতে কেউ আর জীবিত না থাকে। সিদ্ধান্তনুযায়ী তারা লাশের স্তূপ বানাতে থাকে। এমনই এক স্তূপে ছিল বেল্লাল। তার ওপরে ছিল আরো অনেক লাশ। এরপর পিচাশের দল লাশে আগুন লাগিয়ে দেয়। বাতাসে তখন মৃত ও জীবিত মানুষের পোড়া গন্ধ। এমন বিভৎস গন্ধ যে আশপাশ দূরে থাক, দূর থেকেও তীব্র গন্ধ আসছে। মূলত এই গন্ধের কারণে পাক হায়েনার দল দ্রুত একাডেমিতে ফিরে যায়। হায়েনার দল চক্ষু সীমার আড়াল হলেই বেল্লাল কৌশলে লাশের স্তূপ থেকে বের হয়ে আসে। একজন জীবিত মানুষের শরীরে পেট্রোল দিয়ে আগুন লাগানো হল, অথচ সে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা পর্যন্ত করল না! পৃথিবীর কত বিভৎস রূপ এটা! বেল্লাল যতক্ষণে বের হতে পেরেছে ততক্ষণে তাঁর পিঠটা পুরোটা পুড়ে গেছে। শরীরের অন্য স্থানেও পোড়া চিহ্ন আছে। লাশের স্তূপ থেকে বের হয়ে সে ব্যথা উপশমের জন্য নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে। নদীতে তখন জীবত ও মৃত অনেক মানুষ এক সাথে।
 ১৩ই এপ্রিল ঠিক কত মানুষ মারা গেছে তার সঠিক কোন পরিসংখ্যান নাই। আমরা সেদিন বাড়ির পাশে জঙ্গলের মধ্যে গর্তে লুকিয়ে ছিলাম। তবে সেপ্টেম্বর মাসে তারা আমার আব্বাকে ধরে নিয়ে যায়। আমার আব্বা ব্রিটিশ আর্মির সৈনিক ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে অনেক আনসারকে প্রশিক্ষণ দেন। সেই অপরাধে তারা আব্বাকে ধরে নিয়ে যায়। পরে অবশ্য শান্তি কমিটির সভাপতি জয়েন উদ্দিন সরকারের হস্তক্ষেপে আব্বা মুক্তি পায়। আমাদের জিন্নাহ ভাই (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ডীন) সেদিন বেঁচে গেছিল তাঁর নামের কারণে। আরেক বৃদ্ধ যুবক ছেলেদের অকাল প্রয়াণ দেখে স্বচ্ছায় মৃতবরণ করেন। এমন অসংখ্য পরিবারের অসংখ্য ঘটনা আছে। ১৩ই এপ্রিলের মত এত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড দেশের আর কোন স্থানে সংগঠিত হয়েছে কিনা আমাদের জানা নাই। ১৩ ই এপ্রিলের ঘটনার পর আমাদের গ্রামকে সবাই "বিধবাদের গ্রাম" বলে ডাকতে শুরু করে। বিধবাদের পুনঃবাসনের জন্য ১৯৭২ সালে ত্রাণ মন্ত্রী কামরুজ্জামানেরর সার্বিক সহযোগিতায় সুইডিশ সরকারের অর্থায়নে 'থানাপাড়া সোয়ালোজ ডেভেলপমেন্ট সোসাইটি' নামক প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠে। বেল্লাল এখন দুই সন্তানের জনক (বর্তমানে মৃত)। সুখ-দুঃখ সাথে নিয়ে সে সংসার করছে। বেল্লালের ক্ষত এখনো পুরোপুরি সেরে উঠেনি। বেল্লালের ন্যায় বাংলাদেশের ক্ষত এখনো সেরে উঠেনি। বেল্লাল যেন এক টুকরো বাংলাদেশ, আর তাঁর পিঠ যেন এক টুকরো ৭১.
মূল লেখকঃ অধ্যক্ষ মোঃ সাইফুল ইসলাম 
বর্তমান লেখকঃ মোঃ আরিফুল ইসলাম

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

চারঘাটের নদ-নদী, ১ম পর্বঃ গঙ্গা/পদ্মা নদী (Ganges/Padma River)

সরদহ সরকারী/সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় (Sardah Govt. Pilot High School)

বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমী/একাডেমি, সারদা (Bangladesh Police Academy)